নোয়াখালীর সেনবাগে বিদ্যুতের দাবিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটি উপকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা। গতকাল মঙ্গলবার রাত আনুমানিক আটটার দিকে উপজেলার নবীপুর আইচেরটেক এলাকায় ওই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে উপকেন্দ্রের ভেতরের একটি ভবনের জানালার দুটি কাচ ভেঙে যায়। তবে উপকেন্দ্রের দায়িত্বরত কোনো কর্মচারী হামলায় হতাহত হননি। স্থানীয় লোকজনের ভাগ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে সেনবাগ উপজেলার লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪-১৫ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের গ্রাহকেরা। ক্ষুদ্র গ্রাহকেরা মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নবীপুর ইউনিয়নের আইচেরটেক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ঘেরাও করেন। তাঁরা এ সময় বিদ্যুতের দাবিতে সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় সেখানে হাজারখানেক লোকের সমাগম হয়। ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের কয়েকজন এ সময় উপকেন্দ্রের ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। ইটের আঘাতে জানালার দুটি কাচ ভেঙে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে খবর পেয়ে নবীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সেনবাগ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলেন। তখন উপমহাব্যবস্থাপক মুঠোফোনে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যুতের পরিস্থিতি উন্নতির আশ্বাস দেন। এতে গ্রাহকেরা কিছুটা শান্ত হন। পরে চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন গ্রাহকদের বুঝিয়ে যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরে পল্লী বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। এতে গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। যার জেরে মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাহক বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ঘেরাও করেন। তিনি খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং গ্রাহকদের বুঝিয়ে শান্ত করেন।
নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সেনবাগ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মিনারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দুই দিন ধরে বিদ্যুতের লোডশেডিং কিছুটা বেশি। ২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তিনি সরবরাহ পাচ্ছেন ১২ থেকে ১৪ মেগাওয়াট। এতে গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ বিরাজ করছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার রাতে কয়েক শ গ্রাহক নবীপুর এলাকার উপকেন্দ্রের সামনে জড়ো হন। তাঁরা এ সময় সেখানে বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। এ সময় উপকেন্দ্র লক্ষ্য করে কয়েকটি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে জানালার দুটি কাচ ভেঙে গেছে। পরে তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মুঠোফোনে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শান্ত করেন।
নোয়াখালীর সেনবাগ: সংসদ সদস্যের ছেলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের লড়াই
সাইফুল আলম, আবু জাফর
রাত পোহালে আগামীকাল মঙ্গলবার নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমজমাট ভোট আশা করছেন ভোটাররা। নির্বাচনে যাচাই-বাছাইয়ের পর চেয়ারম্যান পদে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে আছেন কেবল দুজন। তাঁরা হলেন নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের ছেলে সাইফুল আলম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর। আবু জাফর মেয়াদে সেনবাগ পৌরসভার মেয়র ছিলেন।
বাকি চার প্রার্থীর কেউ নিজ থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, কেউ সংসদ সদস্যের ছেলে সাইফুল আলম আবার কেউ আবু জাফরকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে এই উপজেলায় ভোটের লড়াই হচ্ছে সংসদ সদস্যের ছেলে সাইফুল আলমের সঙ্গে আবু জাফরের। আবু জাফরের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ রয়েছে। এ কারণে ভোটে এবার সাইফুল আলম ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনে প্রচারণার সময় দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থকদের মধ্যে বড় কোনো সংঘাতের ঘটনা না ঘটলেও সংসদ সদস্যের ছেলে প্রার্থী থাকায় ভোটের দিন কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন, সবই নেওয়া হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সেনবাগ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের সবার মনোনয়ন বৈধ হয়। পরবর্তী সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে দুই প্রার্থী-বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহসভাপতি আতাউর রহমান ভূঁইয়া ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শিহাব উদ্দিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। বাকি ছয়জন প্রার্থীর পাঁচজনই আওয়ামী লীগ–সমর্থক। তাঁরা সবাই প্রতীকও বরাদ্দ পেয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাইফুল আলম ছাড়া বাকি চারজন প্রার্থীর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান সভাপতি-সম্পাদক ছিলেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এস এম জাহাঙ্গীর আলম ওরফে লায়ন মানিক প্রার্থী হলেও তিনি ‘সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায়’ নির্বাচনের প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তিনি কাউকে সরাসরি সমর্থন জানাননি। একইভাবে প্রার্থী হয়েও নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত রয়েছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি জাফর আহম্মদ চৌধুরী।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এ কে এম জাকির হোসাইন প্রার্থী হয়ে প্রতীক বরাদ্দ পেলেও তিনি কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণায় নামেননি। বাকি একজন হলেন আবু জাফর ওরফে টিপু। তিনিই শেষ পর্যন্ত এমপিপুত্র সাইফুল আলমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। তাঁর প্রতীক দোয়াত-কলম। আর এমপিপুত্র সাইফুলের প্রতীক আনারস। আবু জাফরের সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে এমপিপুত্রের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ।
দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের গ্রামের বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার নাটেশ্বর ইউনিয়নে। নাটেশ্বরসহ সোনাইমুড়ী উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও সেনবাগ উপজেলা নিয়ে নোয়াখালী-২ আসন। ‘বহিরাগত’ বিতর্ক এড়াতে মোরশেদ আলম সেনবাগের ভোটার হয়েছেন আগেই। একইভাবে এবার উপজেলা নির্বাচনে ছেলে সাইফুল আলমকে প্রার্থী করার জন্য তাঁকেও সেনবাগের ভোটার করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী আবু জাফর সেনবাগ পৌরসভার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দা। শৈশব থেকেই তিনি সেনবাগে বেড়ে উঠেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম সেনবাগ উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি ও জাহাঙ্গীর আলম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থী হয়েও ভোটের প্রচারণায় না থাকায় তাঁর অনুসারী নেতা-কর্মীরা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আবু জাফরের পক্ষে ভোট করছেন। এতে করে ভোটের মাঠে লড়াইটা হচ্ছে মূলত সংসদ সদস্যের ছেলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের।
ভোটের প্রচারণার বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সংসদ সদস্যের ছেলে ও আনারস প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়। প্রত্যেকবারই ফোন ধরেন তাঁর এক আত্মীয়। প্রার্থী প্রচারে ব্যস্ত আছেন বলে ওই আত্মীয় জানান। তবে দোয়াত-কলম প্রতীকের প্রার্থী আবু জাফর কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তিনি বলেন, সেনবাগ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ এবং সাধারণ ভোটাররা তাঁর পক্ষে। কারণ, তাঁরা বহিরাগত কাউকে নির্বাচিত করতে চান না। চান সেনবাগের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁকে বিজয়ী করতে। সুষ্ঠু ভোট হলে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের কোনো আশঙ্কার কারণ নাই বলে নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এর আগে জেলার সুবর্ণচরের ভোট নিয়েও অনেকের অনেক শঙ্কা ছিল। প্রশাসনের অবস্থান ছিল কঠোর। সেনবাগেও একই অবস্থান থাকবে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। কোনো প্রার্থীর লোক কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ পাবেন না। কেউ চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে ছেলে খুন, বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা
নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের এক পক্ষের হামলায় নিহত তরুণ মাজহারুল ইসলাম ওরফে শাওনছবি: সংগৃহীত
‘আমার শাওন কই, আমার শাওন কই; তোমরা আমার শাওনকে এনে দাও, তারা কেন আমার শাওনকে এভাবে মেরে আমার বুক খালি করল’—ছেলেকে হারিয়ে এমন আহাজারি মা আঞ্জুমান আরার। ছেলেকে খুনের খবর শোনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি; জ্ঞান ফিরলেই খুঁজছেন ছেলেকে।
গতকাল বুধবার রাতে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট বাজারে কিশোর গ্যাংয়ের এক পক্ষের হামলায় খুন হন কলেজপড়ুয়া মাজহারুল ইসলাম ওরফে শাওন (১৮)। এর পর থেকেই মা আঞ্জুমান আরার আহাজারি থামছেই না।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেনবাগ উপজেলায় দুই বছর ধরে ‘এফ-টেন’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য চলছে। উপজেলার সেবারহাটের স্কুল, বিপণিবিতানসহ বিভিন্ন দেয়ালে ‘এফ-টেন’-এর নামে রয়েছে দেয়াললিখন। প্রায়ই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দলটি। মাজাহারুলও এই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই আরেকটি পক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়। এর জেরে তাঁর ওপর হামলা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের উত্তর রাজারামপুর গ্রামে জমাদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের শোকে জ্ঞান হারানো আঞ্জুমান আরার মাথায় পানি ঢেলে তাঁকে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা। জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করতে করতে আবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
সেখানে কথা হয় প্রতিবেশী নাছরিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুই ছেলে ও স্বামী বিদেশে থাকায় এই ছেলেই ছিল আঞ্জুমান আরার হাতের লাঠি। সেই ছেলের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আঞ্জুমান আরার এমন অবস্থা। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কারও সান্ত্বনাই তাঁকে শান্ত করতে পারছে না।
আঞ্জুমান আরার চার সন্তানের চারজনই ছেলে। বড় দুই ছেলে তাঁদের বাবার সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী। বাড়িতে সেজ ছেলে মাজাহারুল ইসলাম আর ছোট ছেলে মো. শায়নকে (১১) নিয়ে থাকতেন মা আঞ্জুমান আরা বেগম (৪০)। বড় দুই ভাই ও বাবার অবর্তমানে বাড়ির সবকিছু দেখভাল করতেন শাওন।
ছেলেকে খুনের ঘটনা শোনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা আঞ্জুমান আরা। মাথায় পানি ঢেলে তাঁকে সুস্থ করার চেষ্টায় স্বজনেরা।
নিহত শাওনের চাচাতো ভাই আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের হৃদয়ের নেতৃত্বে মাজাহারুলের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। এ সময় হৃদয় চিৎকার দিয়ে বলছে—“কে সামনে আসবি আয়, এলে শেষ করে দিব”। এ কারণে ভয়ে কেউ সামনে এগোতে পারেনি।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত মাজাহারুলের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে আজ বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ফেনী সদর হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। বাদ আসর জানাজা শেষে লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের তৎপরতার বিষয়ে ইতিপূর্বে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। তবে এখন যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটিকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধীদের পেছনে যাঁরা আছেন, তাঁদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নোয়াখালীর সেনবাগ থানায় আটকে রেখে এক তরুণকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জয় সিকদারকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারের সাময়িক দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বাক্ষরিত এক আদেশে আজ শুক্রবার সকালে তাঁকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
পৃথক আরেকটি আদেশে তরুণকে নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে বেগমগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসানকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন সেনবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হেলাল উদ্দিন ও সদর সার্কেল কার্যালয়ের পরিদর্শক আবু শাহেদ খান। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা এরই মধ্যে তাঁদের কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে ঢাকায় অবস্থানকারী জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ঢাকা থেকে মুঠোফোনে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এ ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
মারধর ও নির্যাতনের শিকার ওই তরুণের নাম আবদুল্লাহ আল-নোমান (২২)। তিনি সেনবাগ বাজারের একটি দোকানের কর্মচারী। গতকাল দুপুরে থানা হাজতে আটক বড় ভাইয়ের খবর নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হন নোমান। পরে আহত অবস্থায় থানা থেকে ওই দিন দুপুরে সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানে তাঁর অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁকে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এখন সার্জারি বিভাগে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবদুল্লাহ আল–নোমান সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের উত্তর কাদরা মজুমদার পাড়াসংলগ্ন আবু তাহেরের নতুন বাড়ির বাসিন্দা। নোমানের বরাত দিয়ে তাঁর মা তৈয়বের নেছা প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর বড় ছেলে শাহাদাত হোসেনকে বাড়ির পাশ থেকে বিনা কারণে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। খবর পেয়ে তাঁর ছোট ছেলে নোমান বড় ভাইয়ের খোঁজ নিতে থানায় যান। থানায় উপপরিদর্শক সঞ্জয় সিকদারের কাছে শাহাদাত হোসেনকে আটকের কারণ জানতে চান। এ সময় ওই উপপরিদর্শকের সঙ্গে নোমানের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নোমানকে থানার একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বেধড়ক পিটিয়েছেন ওই উপপরিদর্শক। এ সময় নোমান অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
নির্যাতনের শিকার তরুণ আবদুল্লাহ আল নোমানছবি সংগৃহীত
সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাঈম উদ্দিন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সাদাপোশাকের এক পুলিশ সদস্য আবদুল্লাহ আল–নোমানকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। নোমানের বুকে ও পিঠে জখম রয়েছে। তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাঁকে অক্সিজেন দিয়ে হাসপাতালে রাখা হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আহত নোমানের এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, শাহাদাতকে ছেড়ে দেওয়ার নামে এক রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকাও নিয়েছেন সঞ্জয় সিকদার। এরপরও শাহাদাতকে ছেড়ে না দিয়ে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষরের জন্য তাঁদের চাপ দেওয়া হয়। তবে তাঁরা ওই কাগজে স্বাক্ষর করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিদর্শক সঞ্জয় সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, শাহাদাত হোসেনকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছে। তাঁকে থানায় আনার পর তাঁর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সামান্য ঝামেলা হয়েছে। নোমান নামের কাউকে তিনি চেনেন না। নোমানকে কারা হাসপাতালে ভর্তি করেছেন, সেটিও তিনি জানেন না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আটক শাহাদাত কিছুদিন প্রবাসে ছিলেন। সেখানে যে কাজ দেওয়ার কথা ওই কাজ না দেওয়ায় তিনি দেশে এসে ভাইয়ের সঙ্গে একই দোকানে কাজ করতেন। থানায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন, গুলির খোসা উদ্ধার
নোয়াখালীর সেনবাগে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান ভূঁইয়ার সমর্থকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বীজবাগ ইউনিয়নের কাজিরখিল গ্রামে
নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থকের নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেনবাগ উপজেলার বীজবাগ ইউনিয়নের কাজিরখিল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একই ইউনিয়নের মজুমদারহাট বাজারে ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ করা হয়েছে। তবে এই দুই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহসভাপতি মোহা. আতাউর রহমান ভূঁইয়ার ওই সমর্থকের নাম ফয়েজ উল্যাহ। তিনি বীজবাগ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয়কে নির্বাচনী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান ভূঁইয়া অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের লোকজন এই হামলার সঙ্গে জড়িত। তাঁরা এর আগেও ছাতারপাইয়া ইউনিয়নে তাঁর সমর্থকের বাড়িতে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটিয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের কাছে এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তবে সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম হামলা ও গুলির অভিযোগকে সাজানো বলে দাবি করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, যে ইউপি সদস্যের কার্যালয়ে হামলার গল্প সাজানো হয়েছে, তিনি খারাপ প্রকৃতির লোক। তিনি নিজেই নিজের ঘরে ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে অপপ্রচার করছেন। কোনো ধরনের সন্ত্রাস ও সহিংসতায় তিনি বিশ্বাসী নন।
ইউপি সদস্য ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কার্যালয়টি স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমানের নির্বাচনী কার্যালয় হিসেবে তিনি ব্যবহার করছেন। নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীর স্থানীয় কেন্দ্র কমিটির দায়িত্বে আছেন তিনি। গতকাল রাত ১১টার দিকে কার্যালয় বন্ধ করে বাড়িতে যান তিনি। কিছুক্ষণ পরই তাঁর বাড়ির সামনে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন। বেরিয়ে এসে দেখেন বাড়ির সামনে তাঁর কার্যালয়ের ভেতরে আগুন জ্বলছে। এ সময় আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে আগুন নেভান। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কারণেই ওই হামলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বীজবাগ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিন বলেন, গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাজিরখিল গ্রামের মজুমদারহাট বাজারে একদল দুর্বৃত্ত তিনটি মাইক্রোবাস নিয়ে এসে মহড়া দেয়। তারা এ সময় বাজারে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা ও বিস্ফোরিত ককটেলের অংশ উদ্ধার করে। পরে সেনবাগ থানা থেকে পুলিশ গিয়ে সেগুলো জব্দ করে।
সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম উদ্দিন ইউপি সদস্যের ব্যক্তিগত কার্যালয় তথা স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের হামলা-ভাঙচুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার ভাঙচুর করে এবং পোস্টারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী মজুমদারহাটে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় ও গুলি করে। এ ঘটনায় আজ দুপুর পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রিয় পাঠকগণ,
এই ব্লগে প্রকাশিত সকল লেখা আমার নিজস্ব চিন্তাধারায় লেখা। কাউকে হেয় করার জন্য আমি কখনো কিছু লিখি না। তারপরও আমার কোনো লেখায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।